এম.আর রুবেল:
কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলা নির্বাহী অফিসার শবনম শারমিনের বদলির খবরে পুরো ভৈরব যেন থমকে গেছে। ২৬ নভেম্ববর, বুধবার বিকেলে বদলির খবর ছড়িয়ে পড়তেই তাঁকে নিয়ে আলোচনা হচ্ছে ভৈরবের সর্বত্র। চায়ের স্টল থেকে শুরু করে রাজনৈতিক অঙ্গনেও মানুষের মুখে শুধু আফসোস আর বেদনার কথা। অপরদিকে, সোস্যাল মিডিয়া ফেসবুক জুড়েও ইউএনওকে নিয়ে আবেগঘন পোস্ট ও কমেন্ট করছেন রাজনৈতিক নেতা, শিক্ষক, সাংবাদিক থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ। কোনভাবেই তারা শবনম শারমিনের এই বদলির আদেশ মানতে পারছেননা। যাবার মূহুর্তেও নানা প্রশংসায় ভাসছেন এই কর্মকর্তা।
জানাগেছে, আগামী ৩০ নভেম্বর, রবিবার ভৈরব উপজেলা নির্বাহী অফিসার শবনম শারমিনের কাছ থেকে দায়িত্বভার বুঝে নিবেন নবাগত ইউএনও কে.এম মামুনুর রশীদ। নবাগত ইউএনও কে.এম মামুনুর রশীদ পাবনা জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের সিনিয়র সহকারি কমিশনার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ইউএনও হিসেবে এটাই তাঁর প্রথম কর্মস্থল।
প্রশাসনিক একজন কর্মকর্তার বদলি যদিও একটি নিয়মিত সরকারি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে বিভিন্ন উপজেলার প্রশাসনে নতুন উদ্দীপনা আসে এবং অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের নতুন দায়িত্ব দেওয়া হয়। তবুও কোনো প্রিয় কর্মকর্তা চলে গেলে মানুষের মনে এক অদ্ভুত শূন্যতা ও বেদনা সৃষ্টি হয়। কারণ শবনম শারমিন শুধুই একজন অফিসার ছিলেন না। তিনি মানুষের সমস্যা বোঝার ক্ষমতা, আন্তরিকতা ও মানবিক আচরণের মাধ্যমে স্থানীয় জনগণের সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। আর সেই বন্ধনই বিদায়ের মুহূর্তে মানুষকে আবেগে ভাসিয়ে দেয় এবং রুটিন বদলিকেও ব্যক্তিগতভাবে অনুভূত হয় সাধারণ মানুষের মনে।
ফেসবুকে আবেগঘন পোস্টে অনেকেই লিখেন, ইউএনও শবনম শারমিন তাঁর দায়িত্ব পালনের সময় তিনি শুধু প্রশাসনিক কাজই করেননি; মানুষের সুখ-দুঃখ, সমস্যা-সমাধান, উন্নয়ন-পরিকল্পনা সবকিছুই করেছেন আন্তরিকতা, সততা ও মানবিকতার আলো ছড়িয়ে। অসহায় মানুষের কান্না মুছেছেন, ছাত্রদের অনুপ্রেরণা দিয়েছেন, নারীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে থেকেছেন অটল। আর সেই কারণেই তিনি সাধারণ মানুষের কাছে হয়ে উঠেছিলেন এক ভরসার নাম, নিরাপত্তার প্রতীক। ভৈরবের সব উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে তিনি ছিলেন সামনে। তার বিদায়ে যে শূন্যতা তৈরি হবে, তা সহজে পূরণ হবে না। বিদায়ের প্রহর ঘনিয়ে আসতেই ভৈরববাসীর কণ্ঠে একটাই অনুরাগ, একটাই বেদনা-“যাচ্ছেন ইউএনও, কাঁদছে মানুষ।” তাঁর বিদায়ে দোয়া ও শুভকামনা জানিয়েছেন।

ভৈরব উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার বীরমুক্তিযোদ্ধা তোফাজ্জল হক ফেসবুকে কমেন্ট করেন, একজন ভালো মনের মানুষের জন্য দোয়া ও শুভকামনা রইলো।
ভৈরব টেলিভিশন জার্নালিস্ট এসোসিয়েশনের সভাপতি ও দৈনিক যুগান্তরের প্রতিনিধি মো; আসাদুজ্জামান ফারুক তাঁর ফেসবুক পোস্টে লিখেন, কখনও কখনও বিদায় বেদনা দেয়, কষ্টও দেয়। তারপরও সরকারি চাকরিতে বদলি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। ভৈরব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শবনম শারমিনের বিদায়ে ঠিক এমনই অনুভূতি হচ্ছে। একবছর একমাস দায়িত্ব পালনকালে ব্যবসা ও সাংবাদিকতার সূত্রে তাঁর সঙ্গে মাঝেমধ্যে কথা ও মিটিংয়ে দেখা হতো। কাজ ছাড়া তাঁর অফিসে খুব একটা যাইনি। তবুও যতটুকু দেখেছি, তিনি একজন ভালো মানুষ, দক্ষ কর্মকর্তা, অমায়িক ব্যবহারী এবং সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে কাজ করেছেন। আগের অনেক কর্মকর্তার তুলনায় তিনি ছিলেন আরও দায়িত্ববান আমার চোখে স্পষ্ট হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁর দায়িত্ব পালন ছিল কঠিন। তাও একাধিক দায়িত্ব একসঙ্গে সামলাতে গিয়ে প্রায়ই রাতে অফিস করেছেন, পরিবারকে সময় দিতে পারেননি, একথা অনেকেই জানে। কখনও তাঁকে রাগ করতে দেখিনি; সবসময় হাসিমুখে, শান্তভাবে কথা বলেছেন এটি তাঁর বড় গুণ। কোন নির্বাহী কর্মকর্তার বিদায়ে জীবনে কখনও পোস্ট দিইনি। আজ বিবেকের তাড়নায় দিচ্ছি। ম্যাডাম, যেখানে থাকুন পরিবারসহ ভালো থাকুন। আপনার জন্য রইল আন্তরিক শুভকামনা।
রাষ্ট্র ভাবনার সম্বনয়ক নুরুল কাদের সোহেল তাঁর ফেসবুক পোস্টে লিখেন, চরমোনাই মাঠে বসে ফেসবুকে ভৈরবের ইউএনও শবনম শারমিনের বদলির খবর শুনে মনটা ভেঙে গেল। ভৈরবে ছিনতাইয়ের কারণ হিসেবে অন্ধকার ও ভাঙা রাস্তাগুলো চিহ্নিত করে সড়ক মেরামত, ড্রেন পরিষ্কার, রেলস্টেশন রোড, নাটাল ও বাসস্ট্যান্ড রোডে লাইট স্থাপনের কাজগুলো তাঁর আন্তরিক উদ্যোগেই হয়েছে। গত তিনমাসে এসব বিষয়ে বারবার তাঁর অফিসে গিয়েছি এবং দেখেছি তিনি কত নিষ্ঠা নিয়ে কাজ করেন। দলমত নির্বিশেষে সকল মানুষকে মূল্যয়ন করতেন। এবং সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত সমস্যাও সমাধান করার চেষ্টা করতেন। কাউকে সহজে প্রশংসা করি না, কিন্তু ভালো কাজের স্বীকৃতি না দেয়া অকৃতজ্ঞতা। যেখানেই যান, ভালো থাকুন। আপনার ভালো কাজই আপনাকে আরও উচ্চতায় পৌঁছে দিক।
শিমুলকান্দি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আজাহারুল ইসলাম তাঁর ফেসবুক পোস্টে লিখেন, স্যারের বদলির খরব শুনে মনটা সত্যিই খারাপ হয়ে গেল। স্যার অনেক ভালো মানুষ ছিলেন। একজন দক্ষ, কর্মঠ ও রুচিশীল অফিসার তিনি। শিক্ষা ও শিক্ষক পরিবারের সঙ্গে ছিলো তাঁর নিবিড় সম্পর্ক। যেখানেই থাকবেন ভালো থাকেন স্যার আল্লাহ পাকের কাছে দোয়া করি।
রেফারি সুমন রহমান তাঁর ফেসবুক পোস্টে লিখেন, ইউএনও শবনম শারমিন স্যারের বদলিে খবর শুনে মনটা অনেক খারাপ হয়ে গেলো। অনেক ভালো মানুষ ছিলেন, বিগত দুই বছরের অনেক আন্তরিকতার সঙ্গে তিনি কাজ করেছেন। যেখানেই যান দোয়া ও শুভকামনা রইলো। আগামীর দিনগুলোও সুন্দর হোক।
বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক আরকে রিসান তাঁর ফেসবুক পোস্টে লিখেন, আমার দেখামতে ভৈরবের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ ইউএনও আপনি। এই দুইবছরের এক টাকা দুর্নীতির প্রমানকেউ দিতে পারবে না আপনার বিরুদ্ধে। যেখানেই থাকেন ভালো থাকেন, আল্লাহ যেন আপনাকে আরো উচ্চ পর্যায়ে আসীন করনে।
আরও একজন লিখেছেন, “এমন ইউএনও আর পাবো না। তিনি মানুষের কথা শুনতেন, মানুষের পাশে থাকতেন। জনগণের স্বার্থে সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো এমন মানবিক কর্মকর্তা খুব কম পাওয়া যায়। তিনি ছিলেন ব্যতিক্রম।”
একজন সমাজকর্মী তাঁর অনুভূতি জানিয়ে লিখেন, “স্যার, আপনি ছিলেন জনগণের ইউএনও। আপনার বিদায়ে ভৈরব আজ সত্যিই ব্যথিত।
রক্ত সৈনিক শামসুল হক বাদল বলেন, ইউএনও শবনম শারমিন শুধু একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবেই নয়, বরং একজন মানুষের মতোই মানুষের পাশে থেকেছেন। মানুষের সমস্যা শুনেছেন মন দিয়ে, সমাধানে ছুটেছেন নিজের মানুষ ভাবেই। তাঁর সততাই ছিল সবচেয়ে বড় শক্তি। তাঁর প্রতিটি কাজই ভৈরবের মানুষ মনে রাখবে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে।
ইউএনও শবনম শারমিনের বদলি সরকারি রুটিনের অংশ হলেও, মানুষের অনুভূতি বলে, ভৈরব যেন একজন অভিভাবককে হারিয়ে ফেলার গভীর শূন্যতা অনুভব করছে। তাঁর অফিস কক্ষ থেকে শুরু করে উপজেলা চত্বরে এক অদৃশ্য নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। তিনি কিছুদিনের মধ্যেই নতুন ইউএনওকে তাঁর দায়িত্বভার বুঝিয়ে নতুন কর্মস্থলে যোগ দিবেন বলে জানাগেছে।
ভৈরব উপজেলা নির্বাহী অফিসার শবনম শারমিন বলেন, এই উপজেলায় এক বছরেরও বেশি সময় কাজ করেছি। কাজ করতে গিয়ে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের আন্তরিকতা ও ভালোবাসায় অভিভূত হয়েছেন। সাধারণ মানুষ আমাকে অনেক ভালোবাসা দিয়েছে। আমিও চেষ্টা করেছি সততা, ন্যায় ও ইনসাফের সঙ্গে আমার দায়িত্ব পালন করার।
বদলি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বদলি সরকারের নিয়মিত পক্রিয়া। সরকার আমাকে যেখানে পোষ্টিং দিবে সেখোনেই দায়িত্ব করতে হবে। আমি শুধু চাই, যেখানেই যাই সততা, নিষ্ঠা, দক্ষতা ও সুনামের সঙ্গে যেন সরকারের অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে পারি। তিনি আরও বলেন, “আমার বদলি না হলে বুঝতেই পারতাম না ভৈরবের মানুষ আমাকে এত ভালোবাসে। যেখানেই যাই, ভৈরবের প্রতিটি মানুষের এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আমার মনে থাকবে।”
উল্লেখ্য, জুলাই আগষ্ট গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে ভৈরব উপজেলা নির্বাহী অফিসার শবনম শারমিন যোগদানের পর তাঁর সততা ও কর্মদক্ষতায় সাধারণ মানুষজন নতুনভাবে ফিরে পায় তাদের আস্থার ঠিকানা। যোগদানের অল্পসময়ের মধ্যেই তিনি নিজের কর্মদক্ষতা দিয়ে সাধারণ মানুষের ভালোবাসা অর্জন করেন এবং প্রশাসনের বিভিন্ন দফতরসহ উপজেলার সার্বিকচিত্র পরিবর্তনের মাধ্যমে নতুনত্ব ও গতিশীলতা ফিরিয়ে আনেন। গণঅভ্যুতানের পর বিভিন্ন জেলা উপজেলাসহ বিভাগীয় শহরে কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীরা যেখানে প্রতিনিয়তই দুর্নীতির অভিযোগে সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছে। সেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন ভৈরব উপজেলা নির্বাহী অফিসার শবনম শারমিন। তিনি একাধারে নির্বাহী অফিসারের দায়িত্বের পাশাপাশি উপজেলা চেয়ারম্যান ও পৌর প্রশাসকের দায়িত্বও নিষ্ঠা-সততার সঙ্গে পালন করেছেন। এছাড়াও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতির দায়িত্বও তাকেই পালন করতে হয়েছে। কাজের বাড়তি চাপ থাকলেও তার মানবিক আচরণ ও সুন্দর মনমানসিকতার জন্য একজন প্রশাসকের পরিবর্তে সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিতি পেয়েছেন একজন মানবিক মানুষ হিসেবে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসাসহ সাধারণ মানুষেরর সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে ছোট বড় সকল কাজগুলো নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে সমাধান করায় ভৈরববাসীর আন্তরিক প্রশংসায় উদ্ভাসিত হন। তিনি আইনশৃংখলা পরিস্থতি, ভেজাল খাদ্য প্রতিরোধ ও দ্রব্যমুল্যের অতিরিক্ত দামসহ বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান নিষ্ঠার সঙ্গে পরিচালনা করেন এবং দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা ও ভোগান্তি হিসেবে পরিচিত জন্মনিবন্ধনের ভুলসংশোধন ও দ্রুতনিবন্ধন কার্যক্রমকে তার আন্তরিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি অনেকটাই কমিয়ে আনতে সক্ষম হন।
নিউজটুডে/এম.আর রুবেল
