এম.আর রুবেল:
“বিদায়ের কোনো ভাষা নেই; আর কিছু অনুভূতি কখনোই শব্দে ধরা দেয় না। যে বিদায় হৃদয় ভেঙে দেয়, সেই বিদায়ের গল্পও নীরবতার আড়ালেই গভীরভাবে লেখা থাকে।” বরণ নয়, বরং আজ এমন একজন মানুষকে ফুলের তোড়া দিয়ে বিদায় জানাতে ভৈরব প্রেসক্লাবে একত্রিত হন সংবাদকর্মীরা। তিনি হলেন, সদ্য বিদায়ী ভৈরব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শবনম শারমিন।
বদলি জনিত এই সংবর্ধনার মধ্যমণি শবনম শারমিন একজন দায়িত্বশীল ও সুযোগ্য প্রশাসকই নন, ছিলেন একজন মানবিক মানুষ। আর সাধারণ মানুষের মতো তাঁর প্রতি ভালোবাসা, সম্মান ও মমতায় সংবাদকর্মীদের চোখে-মুখে ফুটে উঠেছিল বিদায়ের বেদনা। কর্মদক্ষতা আর মানবিকতায় ভৈরববাসীর হৃদয়ে যে গভীর ছাপ তিনি রেখে গেছেন, তা কখনই ভুলে যাওয়ার নয়। এই বিদায়ের মুহূর্ত যেন তারই নীরব সাক্ষী।

২৮ নভেম্বর, শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টায় ভৈরব প্রেসক্লাবে আয়োজিত বদলি জনিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের মঞ্চে হৃদয় ভরা ভালোবাসায় আবেগ সামলাতে না পেরে অশ্রুসিক্ত হলেন বিদায়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শবনম শারমিন। অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে তিনি টিস্যু দিয়ে বারবার চোখের পানি মুছছিলেন। নিজের নিয়ন্ত্রণ হারাতে না চাইলেও সাংবাদিকদের একনিষ্ঠ ভালোবাসা তাকে বারবার থামিয়ে দিচ্ছিল। ইউএনওকে অশ্রুসিক্ত দেখে সবাই আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন। এই আবেগঘন মুহূর্ত দেখে মনের অজান্তেই উপস্থিত সাংবাদিকদের চোখেও ঝরে বেদনার জল।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ইউএনও শবনম শারমিনের কণ্ঠ ভারী হয়ে উঠে। তিনি সুচারু কন্ঠে বলেন, “ভৈরব আমাকে শুধু সম্মানই দেয়নি, দিয়েছে অগাধ ভালোবাসা। এখানে কাজ করার প্রতিটি দিন আমার জন্য ছিল শেখার, বোঝার এবং মানুষের সঙ্গে মিশে যাওয়ার অভিজ্ঞতা। সত্যিই ভৈরব আমার হৃদয়ে বিশেষ জায়গা বানিয়ে নিয়েছে।

আজ এই ভালোবাসাকে সঙ্গী করে আমি নতুন কর্মস্থলের পথে যাচ্ছি। আপনাদের আন্তরিকতা, সহযোগিতা আর সুন্দর আচরণ কখনো ভুলতে পারব না। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সংবাদিক, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনের সহকর্মীসহ সবাই যে ভাবে আমাকে সমর্থন করেছেন, তা আমার জন্য সৌভাগ্যের। এই বিদায় শুধু স্থানান্তর, সম্পর্কের বিদায় নয়। ভৈরবে আমার স্মৃতি, আপনাদের প্রতি আমার শ্রদ্ধা, সবকিছু আমি সাথেই রাখব। আপনারা সবাই ভালো থাকবেন, ভৈরব ভালো থাকুক এই প্রত্যাশা করি।
এসময় তিনি ভৈরবের বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রমের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন। রাস্তাঘাট নির্মাণ, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, শহরের লাইটিং, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সবক্ষেত্রেই সমন্বিতভাবে কাজ করার স্মৃতি তুলে ধরেন তিনি। ভৈরব পৌরসভার রাস্তাঘাটকে ময়লা-আবর্জনা মুক্ত করতে একটি ডাম্পিং স্টেশন নির্মাণ এবং প্রতিবন্ধীদের জন্য একটি বিশেষায়িত স্কুল প্রতিষ্ঠার কাজ সম্পূর্ণ করে যেতে না পারায় দুঃখও প্রকাশ করেন ইউএনও শবনম শারমিন।

তিনি আরও বলেন, আমি হয়তো দায়িত্বে থাকছি না, কিন্তু ভৈরবের উন্নয়ন থেমে থাকবে না। আগামী এক বছরের মধ্যেই শহরের চলমান অবকাঠামোগত কাজগুলো সম্পন্ন হলে ভৈরববাসী একটি সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও আধুনিক শহরের অনুভূতি পাবে। ডাম্পিং স্টেশনের অনুমোদনও দ্রুতই সম্পন্ন হবে বলে আশ্বাস দেন তিনি। পাশাপাশি উপজেলা কমপ্লেক্সের ভিতরে প্রতিবন্ধী স্কুল নির্মাণের কাজ সমাপ্ত করা ও স্কুলটি চালু করতে নবাগত ইউএনওকে সহযোগিতা করার জন্য ভৈরববাসীর প্রতি অনুরোধ জানান।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সাংবাদিকরা বলেন, ইউএনও শবনম শারমিন দায়িত্ব পালন করেছেন মানবিকতা, সততা ও পেশাদারিত্বের সমন্বয়ে। দুর্যোগ মোকাবিলা, সামাজিক ইস্যু, সেবা কার্যক্রম কিংবা সাধারণ মানুষের সমস্যা সব জায়গায় তিনি ছিলেন সরাসরি মাঠে। যা আমরা কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেছি। তিনি ছিলেন ভৈরবের মানুষের সুখ-দুঃখের আপনজন। তাঁরা আরো বলেন, সরকারী কর্মকর্তারা বদলি হন নিয়ম অনুযায়ী, কিন্তু কিছু মানুষ হৃদয়ে জায়গা করে নেন। ইউএনও শবনম শারমিন সেই ধরনের একজন। নতুন কর্মস্থলেও তিনি তাঁর সততা, দক্ষতা ও মানবিকতা দিয়ে সবার মন জয় করবে এটাই প্রত্যাশা করেন।
অনুষ্ঠানের শেষে সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে ইউএনও শবনম শারমিনকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানো হয় এবং তাকে স্মারক সম্মাননা, বই ও বিভিন্ন গিফট প্রদান করা হয়। এদিকে ইউএনও শবনম শারমিনের পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতাস্বরূপ সাংবাদিকদেরকে রজনীগন্ধা ফুলের স্টীক ও কলম উপহার দেয়া হয়।

ওই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ভৈরব প্রেসক্লাব আহবায়ক ও এনটিভির স্টাফ রিপোর্টার মোস্তাফিজ আমিন। এসময় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন, ভৈরব প্রেসক্লাব সদস্য সচিব সোহেলুর রহমান, পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফ সারোয়ার বাতেন, ভৈরব টেলিভিশন জার্নালিস্ট এসোসিয়েশনের সভাপতি ও দৈনিক যুগান্তরের ভৈরব প্রতিনিধি মো: আসাদুজ্জামান ফারুক, সহ-সভাপতি তুহিনুর রহমান, দৈনিক প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক মো: সুমন মোল্লা, রিপোর্টার্স ক্লাব ও ইউনিটির সাধারণ সম্পাদক মো: আলাল উদ্দিন প্রমুখ। এছাড়াও স্মৃতিচারণমুলক বক্তব্য রাখেন, বাংলা টিভির ভৈরব প্রতিনিধি এম.আর সোহেল, জিটিভির ভৈরব প্রতিনিধি এম.এ হালিম, এসএ টিভির ভৈরব প্রতিনিধি খাইরুল ইসলাম সবুজ, দৈনিক নয়া শতাব্দীর ভৈরব প্রতিনিধি ও নিউজ টুডে বিডি’র সম্পাদক এম.আর রুবেল, দৈনিক কালবেলার ভৈরব প্রতিনিধি মো: জামাল আহমেদ, দৈনিক সমকালের ভৈরব প্রতিনিধি মিলাদ হোসেন অপু, দৈনিক কালের কন্ঠ ডিজিটালের ভৈরব প্রতিনিধি রাজীবুল হাসান প্রমুখ।
এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন ৭১টিভির ভৈরব প্রতিনিধি আল আমিন টিটু, দৈনিক প্রতিদিনের সংবাদের ভৈরব প্রতিনিধি মিজানুর রহমান পাটোয়ারী, সাপ্তাহিক সময়ের দৃশ্যপটের বার্তা সম্পাদক নাজির আলামিন, দৈনিক গণমানুষের আওয়াজের ভৈরব প্রতিনিধি এম আর ওয়াসিম, ডিবিসির ভৈরব প্রতিনিধি আফসার হোসেন তূর্জা, বিজয় টিভির ভৈরব প্রতিনিধি সোহানুর রহমান সোহান, আরটিভির ভৈরব প্রতিনিধি সিদরাতুল রশিদ পিয়াল, দৈনিক স্বাধীন বাংলার ভৈরব প্রতিনিধি মো: জুয়েল মিয়াসহ বিভিন্ন প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন মিডিয়ার অর্ধশতাধিক সাংবাদিক।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে ভৈরবে উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে শবনম শারমিন যোগদান করার ১৩মাসের মাথায় গত ২৬ নভেম্বর, বুধবার তাঁর বদলির আদেশ আসে। আগামীকাল ৩০ নভেম্বর, নবাগত ইউএনও কে.এম মামুনুর রশীদকে দায়িত্বভার বুঝে দিয়ে তাঁর নতুন কর্মস্থলে যোগ দিবেন বিদায়ী ইউএনও শবনম শারমিন।
নিউজটুডে/এম.আর রুবেল
