কিশোরগঞ্জের ভৈরবে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থসহ আটক হওয়া দুই স্বর্ণকারকে প্রায় ২১ ঘণ্টা পর থানা থেকে ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ। একই সঙ্গে তাদের কাছ থেকে জব্দ করা ১ কোটি ৮৫ হাজার টাকাও ফেরত দেওয়া হয়েছে। আটককৃতরা হলেন, শহরের গাছতলাঘাট এলাকার সপু দেবনাথ (৩০) ও ভৈরব বাজারের শীমল দেবনাথ ২৭)। আটক হওয়া ব্যক্তির মধ্যে সপু দেবনাথ ভৈরব বাজারের ‘কথা শিল্পালয়’ নামের স্বর্ণের দোকানের মালিক।
আজ ১২মার্চ, বৃহস্পতিবার রাত ৯টার দিকে জব্দকৃত টাকা ফেরতসহ আটককৃতদের ছেড়ে দেয়ায় জনমনে নানান প্রশ্ন উঠে। অভিযোগ রয়েছে, ভৈরব সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মো: ফয়জুল ইসলামকে ম্যানেজ করে বিষয়টি রফাদফা করা হয়। একটি সূত্র জানান, সহকারী পুলিশ সুপার ফয়জুল ইসলাম নিজেই সব কিছু যাচাই-বাছাই করে ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তবে ভৈরব সার্কেলের এএসপি রফাদফার বিষয়টি অস্বীকার করছেন।
জানাযায়, গতকাল বুধবার (১১ মার্চ) রাত আনুমানিক সাড়ে ১১টার দিকে ভৈরব শহরের রেলওয়ে স্টেশন রোডের পৌর কবরস্থানের সামনে টহল পুলিশের অভিযানের সময় টাকার বস্তা নিয়ে রিক্সাযোগে যাওয়া পথে সপু দেবনাথ ও শীমল দেবনাথকে আটক করে। এসময় তাদের কাছ থেকে একটি বস্তায় ও একটি কাঁধব্যাগে থাকা ১কোটি ৮৫ হাজার টাকা জব্দ করা হয়।
বিপুল পরিমাণ টাকা জব্দ ও দুই স্বর্ণকারকে আটকের পর টাকা ফেরত ও আটককৃতদের ছাড়াতে রাতেই থানায় যোগাযোগ করেন স্বর্ণকার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি স্বপন দেবনাথসহ একটি প্রভাবশালী মহল। পরে সারাদিনের নাটকীয়তার পর আজ বৃহস্পতিবার রাত ৯টার দিকে তাদের মুক্তি দেওয়া হয়। সাথে ফেরত দেয়া হয় জব্দকৃত টাকা। পুলিশের এমন রহস্যজনক ভুমিকায় সাংবাদিক মহলসহ জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ভৈরব থানার অফিসার ইনচার্জ আতাউর রহমান আকন্দের দাবি, প্রকৃত ঘটনা যাচাই-বাছাই করে টাকার বৈধ উৎস প্রমাণিত হওয়ায় তাদের ছেড়ে দেয়া হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ওই রাতে ভৈরব থানার সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) শাহ আলম সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে পৌর কবরস্থানের সামনে চেকপোস্ট এলাকায় টহল ডিউটিতে ছিলেন। এ সময় চট্টগ্রামগামী মহানগর এক্সপ্রেস ট্রেন থেকে নেমে রিকশাযোগে ভৈরব বাজারের দিকে যাচ্ছিলেন সপু দেবনাথ ও তার সহকর্মী শীমল দেবনাথ। রিকশাটি কবরস্থানের সামনে পৌঁছালে তাদের আচরণ সন্দেহজনক মনে হওয়ায় পুলিশ রিকশার গতি রোধ করে তল্লাশি চালায়। তল্লাশির একপর্যায়ে তাদের সঙ্গে থাকা দুটি বস্তা থেকে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ পাওয়ায় তাৎক্ষণিক ভৈরব থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ আতাউর রহমান আকন্দ এবং ভৈরব সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপারকে ঘটনাটি জানান এসআই শাহ আলম। পরে ভৈরব সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার ও ভৈরব থানার ওসি ঘটনাস্থলে এসে উদ্ধার হওয়া অর্থ ও আটক ব্যক্তিদের ভৈরব থানা পুলিশের হেফাজতে নেন। এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। আটককৃত ব্যক্তিরা স্বর্ণ ব্যবসার আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে হুন্ডি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত হয়ে ভৈরব বাজারের স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভৈরব স্বর্ণ ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি স্বপন দেবনাথ বলেন, তাঁর পাশের দোকানের মালিক সপু দেবনাথ তার ম্যানেজারকে দিয়ে কয়েকজন ব্যবসায়ীর স্বর্ণ ঢাকায় বিক্রি করে মহানগর ট্রেনে ভৈরব স্টেশনে নেমে বাড়ি যাওয়ার পথে পুলিশ ১কোটি ৮৫ হাজার টাকাসহ তাদের আটক করে থানায় নিয়ে যায়। ঘটনা শুনে রাতেই থানায় যোগাযোগ করি। আজ সকালে প্রয়োজনীয় প্রমাণাদি জমা দেয়ার পর রাতে আটককৃতদের ছেড়ে দেয় এবং জব্দ হওয়ার টাকা ফেরত দেন।
ভৈরব থানার অফিসার ইনচার্জ আতাউর রহমান আকন্দ বিপুল পরিমাণ টাকা জব্দ ও দুইজনকে আটক হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন তথ্য যাচাই-বাছাই করে টাকার বৈধ উৎসের প্রমাণ দেয়ায় উর্ধতন কতৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে আটক হওয়া ব্যক্তিদের ছেড়ে দেয়া হয় এবং সঙ্গে জব্দ হওয়া টাকা ফেরত দেয়া হয়েছে। যাচাই-বাছাই করার জন্য তাদের ছাড়তে কিছুটা সময় নেয়া হয়। তারপরও পরবর্তীতে যদি কোন সমস্যা হয় আইনগত পদক্ষেপ নেয়া হবে।
ভৈরব সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মো: ফয়জুল ইসলাম রফাদফার বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, টাকার বৈধ উৎস যাচাই-বাছাই করতে সময় লেগেছে। ঢাকার তাঁতী বাজারের বীথি নামক স্বর্ণের দোকানে ৪৫ ভরি স্বর্ণ বিক্রির টাকা এগুলো। ৭লাখ টাকা আটককৃতের একাউন্টে আগেই পাঠিয়ে দেয়া হয়। রাতে বাকী ১কোটি ৮৫ হাজার টাকা নিয়ে ট্রেনযোগে ভৈরব স্টেশনে নেমে বাড়ি যাওয়ার পথে পুলিশ আটক করে। তিনি বলেন, ওই সময় টাকার সঙ্গে স্বর্ণ বিক্রির রশিদ ছিলোনা। সকাল ১১টায় রশিদ নিয়ে আসলে তা যাচাই-বাছাই করার পর উর্ধতন কতৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে রাত ৯টার দিকে উপজেলা বিএনপি সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম ও ভৈরব বাজারের স্বর্ণ ব্যবসায়ীর জিম্মাই আটককৃতদের ছেড়ে দেয়া হয় এবং জব্দকৃত টাকা বুঝিয়ে দেয়া হয়।
নিউজ টুডে / এম.আর রুবেল






