বাংলাদেশের মানচিত্রে কিছু জনপদ আছে, যাদের গুরুত্ব কেবল প্রশাসনিক সীমানায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং ভৌগোলিক অবস্থান, যোগাযোগের কেন্দ্রিকতা ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কারণে তারা স্বভাবতই কৌশলগত গুরুত্ব অর্জন করে। বাংলাদেশের ৪৯৫টি উপজেলার মধ্যে কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরব উপজেলা তেমনই একটি জনপদ। রাজধানী ঢাকা থেকে সড়ক ও রেলপথে সিলেট, চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহ—এই তিন বিভাগের সঙ্গে সংযোগের যে কেন্দ্রবিন্দু, সেটিই ভৈরব। ভৌগোলিক বাস্তবতায় এটি কেবল একটি উপজেলা নয়; বরং মধ্য-বাংলাদেশের প্রবেশদ্বার।
আঠারো শতকের রেনেলের মানচিত্রে ভৈরবের নাম না থাকলেও ইতিহাস বলছে, মেঘনা নদী ও ব্রক্ষপুত্র নদ-এর পলিবিধৌত বদ্বীপ একসময় ‘উলুকানদি’ নামে পরিচিত ছিল। পরবর্তীকালে নবীনগর এলাকার জমিদার ভৈরব রায়ের উদ্যোগে এখানে গড়ে ওঠে মানব বসতি এবং তাঁর নামানুসারেই ‘ভৈরব বাজার’-এর প্রচলন ঘটে। অর্থাৎ ভৈরবের জন্মই হয়েছে নদী ও বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে। সেই ঐতিহাসিক সূত্র আজও অটুট, ভৈরব এখনো বন্দরনগরী, এখনো ব্যবসায়ীদের শহর।
মেঘনার তীরে প্রায় ১২১.৭৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই উপজেলায় রয়েছে সাতটি ইউনিয়ন ও একটি প্রথম শ্রেণির পৌরসভা। দেশের অন্যতম বৃহৎ কয়লা পাইকারি কেন্দ্র, পুরান ঢাকার পর জুতা উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান এবং রাতের মাছের আড়তের ব্যাপ্তি- সব মিলিয়ে ভৈরব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের এক প্রাণকেন্দ্র। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কি পরিকল্পিত উন্নয়নে রূপ পেয়েছে? বাস্তবতা বলছে, ভিন্নকথা।
ভৈরবের কৃতী সন্তানের তালিকাও কম গৌরবের নয়। সাম্যবাদী চিন্তক ও বিপ্লবী লেখক রেবতী মোহন বর্মন, বাংলাদেশের ১৯তম রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামি কমান্ডার আব্দুর রউফ- এইসব ব্যক্তিত্ব ভৈরবের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক পরিচয়কে উজ্জ্বল করেছে। কিন্তু তাঁদের উত্তরাধিকার কতটা প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছে, সেটিই আজকের প্রশ্ন।
বাস্তব চিত্র হলো শহরকেন্দ্রিক কিছু উন্নয়ন থাকলেও গ্রামাঞ্চল এখনো অবকাঠামোগত ঘাটতি, সাংস্কৃতিক পশ্চাৎপদতা ও গোষ্ঠীকেন্দ্রিক সংঘাতের সমস্যায় জর্জরিত। ব্যক্তিনির্ভর রাজনৈতিক সংস্কৃতি গণতান্ত্রিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে। উন্নয়ন যেন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কৃতিত্বে সীমাবদ্ধ, সমন্বিত পরিকল্পনায় নয়। অথচ ভৈরব মানে শুধু পৌরসভা নয়; এটি একটি বিস্তৃত জনপদ, যার প্রভাব বিস্তার করেছে বাজিতপুর, কুলিয়ারচর, রায়পুরা, বেলাবো ও আশুগঞ্জের অংশবিশেষ পর্যন্ত। এই আঞ্চলিক বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে পরিকল্পনা না করলে ভৈরবের সম্ভাবনা অপূর্ণই থেকে যাবে।
ভৈরবের উন্নয়ন ভাবনায় প্রথমেই প্রয়োজন পরিকল্পিত নগরায়ন। দুর্জয় মোড়ের যানজট, অপরিকল্পিত টিকিট কাউন্টার, অপ্রশস্ত সড়ক- এসব কেবল দৈনন্দিন দুর্ভোগ নয়; এগুলো বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের অন্তরায়। একটি আধুনিক বাস টার্মিনাল, প্রশস্ত ও টেকসই সড়ক, কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে ভৈরবের বাণিজ্যিক গতি বহুগুণ বাড়বে। যোগাযোগ অবকাঠামোই উন্নয়নের প্রথম শর্ত—এই সত্য অস্বীকারের সুযোগ নেই।
দ্বিতীয়ত, মেঘনাকেন্দ্রিক শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার সম্ভাবনা এখনো অক্ষত। জগন্নাথপুর সেতু থেকে ভৈরব শহরের পশ্চিম-দক্ষিণ হয়ে তা ফেরিঘাট পর্যন্ত এবং সেখান থেকে কোদালকাঠি, ছাতিয়ানতলা, লুন্দিয়া-খলাপাড়া হয়ে মেন্দিপুর পর্যন্ত গ্রামাঞ্চল সংযুক্ত করে সুপ্রশস্ত সড়ক ও বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা গেলে নদীকেন্দ্রিক শিল্পায়নের দ্বার উন্মোচিত হবে। এতে একদিকে যেমন রাজধানী ঢাকার ওপর চাপ কমবে, অন্যদিকে আঞ্চলিক অর্থনীতি বিকেন্দ্রীকরণ হবে। নারায়ণগঞ্জ ও চাঁদপুর বন্দরের অভিজ্ঞতা দেখায়- নদীভিত্তিক বাণিজ্য সঠিক পরিকল্পনায় জাতীয় অর্থনীতিকে গতিশীল করতে পারে। ভৈরবও পারে সেই ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে।
তৃতীয়ত, উচ্চশিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন ছাড়া কোনো অঞ্চল টেকসই উন্নয়নে পৌঁছাতে পারে না। একটি সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়, প্রকৌশল ও মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা ভৈরবকে চার বিভাগের শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত করতে পারে। একইসঙ্গে কলেজভিত্তিক ছাত্র সংসদ নির্বাচন চালু করে গণতান্ত্রিক চর্চার বিকাশ ঘটানো জরুরি। রাজনৈতিক সচেতনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি ছাড়া উন্নয়ন কেবল অবকাঠামোতেই সীমাবদ্ধ থাকে। চতুর্থত, গ্রামাঞ্চলে গোষ্ঠীভিত্তিক সংঘর্ষ ও সামাজিক অস্থিরতা রোধে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও খেলাধুলার প্রসার অপরিহার্য। সামাজিক সম্প্রীতি নিশ্চিত না হলে শিল্পায়ন ও বিনিয়োগ দীর্ঘস্থায়ী হয় না। উন্নয়ন মানে কেবল সড়ক-সেতু নয়; উন্নয়ন মানে মননের পরিবর্তন।
ভৌগোলিক সুবিধা, নদীপথ, রেল ও মহাসড়ক- সব মিলিয়ে ভৈরব চাইলে একটি অর্থনৈতিক জোন, পর্যটনকেন্দ্র ও ক্রীড়ানগরী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম, নদীকেন্দ্রিক পর্যটন অবকাঠামো এবং আধুনিক বন্দর সুবিধা গড়ে উঠলে ভৈরব সত্যিই ‘ভাটিবাংলার দ্বার’ হয়ে উঠতে পারে। তখন এটি শুধু একটি উপজেলা থাকবে না; বরং চার বিভাগের সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে জাতীয় উন্নয়নের চালিকাশক্তিতে রূপ নেবে।
অতএব প্রশ্নটি স্বপ্নের নয়, সদিচ্ছার। নেতৃত্বের দূরদর্শিতা, প্রশাসনের সমন্বয় এবং জনগণের ঐক্য থাকলে ভৈরবকে বাংলাদেশের এক মডেল উপজেলায় রূপান্তর করা অসম্ভব নয়। সম্ভাবনার ভৈরবকে বাস্তবতার ভৈরবে রূপ দিতে এখন প্রয়োজন সুসংগঠিত পরিকল্পনা ও দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার। ভৈরব যদি জাগে, জাগবে এক বিস্তৃত অঞ্চল। আর সেই জাগরণই হতে পারে বাংলাদেশের আঞ্চলিক উন্নয়নের নতুন ভূরাজনীতির সূচনা।
— এম. এ. বাকী বিল্লাহ
কলামিস্ট ও রাজনীতি বিশ্লেষক
নিউজ টুডে / এম.আর রুবেল
